ভোজ্যতেল, সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়লেও মূল্যস্ফীতি কমা নিয়ে নানা প্রশ্ন

দেশে পুরো এপ্রিলেই ঊর্ধ্বমুখী ছিল সবজির দাম। বাজারে পটোল, ঢেঁড়স, ঝিঙে, বরবটি, বেগুনসহ বেশির ভাগ সবজির কেজি বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬০-৮০ টাকায়। কোনো কোনোটা কিনতে হচ্ছে এর চেয়েও বেশি দামে।

দেশে পুরো এপ্রিলেই ঊর্ধ্বমুখী ছিল সবজির দাম। বাজারে পটোল, ঢেঁড়স, ঝিঙে, বরবটি, বেগুনসহ বেশির ভাগ সবজির কেজি বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬০-৮০ টাকায়। কোনো কোনোটা কিনতে হচ্ছে এর চেয়েও বেশি দামে। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের মূল্যও গত মাসে ১২-১৪ টাকা বেড়েছে। ডজনপ্রতি ডিমের দাম বেড়েছে অন্তত ২০-৩০ টাকা। বেড়েছে পেঁয়াজ ও রসুনের দামও। নিত্যপণ্যের মূল্যের এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যেও এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি কমার তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। যদিও কীভাবে মূল্যস্ফীতি কমেছে সে ব্যাখ্যা নেই খোদ সংস্থাটির কাছেও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিবিএসের তথ্যের সঙ্গে বাজারের কোনো সামঞ্জস্য নেই। তাদের ভাষ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আশা ছিল সরকারি পরিসংখ্যান ও তথ্য সংশোধন হবে। বিবিএসসহ অন্যান্য সংস্থার সংস্কার হবে। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। বিবিএস আগের মতোই তথ্য প্রকাশ করে যাচ্ছে।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে প্রায় তিন বছর ধরে। গত ২০২৪ পঞ্জিকাবর্ষে দেশের গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আর অর্থবছরের হিসাবে গত তিন অর্থবছর জুড়েই দেশের গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ শতাংশের ওপরে। মূল্যস্ফীতি এতটা উসকে ওঠার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল খাদ্যপণ্যের। কারণ তিন বছর ধরেই দেশে এসব পণ্যের দাম ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিবিএসের তথ্যের সঙ্গে বাজারের কোনো সামঞ্জস্য নেই বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনসহ সব ক্ষেত্রেই সরকারি সংস্থাগুলো যেসব তথ্য এতদিন দিয়ে এসেছে, সেগুলোর সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এসব পরিসংখ্যান ও তথ্য সংশোধন হবে। বিবিএসসহ অন্যান্য সংস্থার সংস্কার হবে। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। বিবিএস আগের মতোই তথ্য দিয়ে যাচ্ছে।’

খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে জোরালো করে তোলার ক্ষেত্রে সবজির দাম বরাবরই বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি হিটম্যাপ অনুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি হিসাবের ক্ষেত্রে সবজির ভার ধরা হয় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। বিবিএস ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাস তথা জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সবজির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এর মধ্যে জুলাইয়ে সবজিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩১ দশমিক ২ শতাংশ। আগস্টে এ হার কিছুটা কমলেও সেটি ২৬ দশমিক ২ শতাংশ ছিল। আর সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল ২২ দশমিক ৭ শতাংশ। অক্টোবরে এসে সবজির দাম আবারো অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। ওই মাসে মূল্যস্ফীতির হার ঠেকে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশে। এরপর নভেম্বর ও ডিসেম্বরেও এ হার ছিল যথাক্রমে ২৭ দশমিক ৯ ও ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে শীতের সবজি বাজারে আসায় এর দাম কমে আসে। এর প্রভাবে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হারও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে এ হার ৯ দশমিক ২৪ শতাংশে নামার পর মার্চে আরো নেমে ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়। বিবিএসের দাবি অনুযায়ী, এপ্রিলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। কিন্তু গত মাসের বাজার পরিস্থিতির মধ্যে সরকারি এ সংস্থার দাবি নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

মুস্তফা কে মুজেরী বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক পদে রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল দেশের অর্থনীতির তথ্য-উপাত্ত ঠিক করা। কারণ পরিসংখান ও তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে নীতি প্রণয়ন করতে হয়। কিন্তু আমরা দেখছি, ১০ মাস পরে এসে সরকার বিবিএস নিয়ে একটি কমিটি করেছে। ওই কমিটি কতদিন পর প্রতিবেদন জমা দেবে, এরপর সেটি বাস্তবায়ন হবে, সেটি আমরা জানি না। সরকার তথ্য-উপাত্ত ঠিক করার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দেয়নি। বিবিএস বলছে, এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি কমেছে। কিন্তু আমরা যারা বাজারে যাই, তারা দেখছি, বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে।’

রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ একাধিক বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঈদুল ফিতরের পর পুরো এপ্রিলেই শাকসবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে শীতে কমে আসা সবজির দাম। বাজারে প্রতি কেজি সবজির দাম ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে পেঁয়াজ, রসুনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম। আর ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১৪ টাকা বাড়িয়ে ১৮৯ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১২ টাকা বাড়িয়ে ১৬৯ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি হিটম্যাপ অনুযায়ী, ভোজ্যতেলের ভার রয়েছে ২ দশমিক ১ শতাংশ। আর ডিম ও দুধের ভার ২ দশমিক ৪ শতাংশ। এপ্রিলে এসব পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কোনো চাপ মূল্যস্ফীতির তথ্যে দৃশ্যমান নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের তুলনায় এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার কমেছে। মার্চে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এপ্রিলে এ হার ৯ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমেছে। গত মাসে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতি কমেছে বলে দাবি করেছে বিবিএস। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ হয়েছে। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭০ থেকে কমে হয়েছে ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমার সরকারি তথ্যের সঙ্গে মোটেই একমত নন বেসরকারি চাকরিজীবী নজরুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিবিএসের তথ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমার যে দাবি করা হয়েছে আমি সেটির সত্যতা দেখছি না। কারণ জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে সবজির দাম যা ছিল এখন তা দুই-তিন গুণ। পেঁয়াজ, রসুন, ভোজ্যতেল, ডিমসহ অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়েছে। তাহলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমল কীভাবে?’

বিবিএস এপ্রিলে মূল্যস্ফীতির যে হার দেখিয়েছে, সেটিও অনেক বেশি বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, আমাদের দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ৩-৪ শতাংশ মানা যায়। এর বেশি কিছুতেই হওয়া উচিত নয়। যদি হয় সেটি বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে এখন প্রতিটি খাদ্যপণ্যের দাম নিম্নমুখী। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে তার কোনো প্রতিফলন নেই। বিশ্ববাজারে সয়াবিনের দাম কমলেও গত মাসে দেশে বেড়েছে। এপ্রিলে চালের দামও ঊর্ধ্বমুখী ছিল। গত তিন বছরে প্রতিবেশী প্রতিটি দেশেই মূল্যস্ফীতির হার দ্রুতগতিতে কমেছে। কিন্তু আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের হার খুবই ধীর।’

সবজিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম এপ্রিলে বাড়লেও মূল্যস্ফীতি কীভাবে কমল—এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা মাঠের তথ্য নিয়ে এসেছি। নিত্যপণ্যের দাম কম ছিল। দাম নিয়ে মানুষের অভিযোগও কম ছিল। আমাদের কাজ তথ্য সংগ্রহ করে মূল্যস্ফীতির হার প্রকাশ করা। এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যার দরকার হলে অর্থনীতিবিদরা ভলো বলতে পারবেন। ব্যাখ্যা দেয়া আমাদের কাজ নয়।’

আরও